মুফতি হাফেজ আহসান জামিল,
দিনা থেকে প্রায় আশি মাইল পূর্ব দক্ষিণে অবস্থিত একটি বাণিজ্য কেন্দ্রের নাম বদর। সে সময় এখানে পানির প্রাচুর্য থাকায় স্থানটির গুরুত্ব ছিল অধিক। আর এখানেই দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ রমজান মোতাবেক ৬২৪ খ্রীস্টাব্দের ১১ মার্চ শুক্রবার ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি একটি যুদ্ধ মনে হলেও এর ফলে পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিপ্লব সূচিত হয়েছিল। আর তাই কোরআনের ভাষায় একে ইয়াওমুল ফোরকান বলা হয়েছে। ঐতিহাসিক পি কে হিট্টি একে ইসলামের প্রকাশ্য বিজয় বলে অবহিত করেছেন। যে ঘটনার ইঙ্গিতে এ যুদ্ধের সূত্রপাত আর এত বড় মহান বিজয়। ইসলাম ও নবীকরীম সা. এর চরম শুত্রু কাফেররা মনে করেছিল মহানবী সা. এর শক্তি মদিনায় দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এখনই ঠেকানো না যায় তাহলে ইসলাম ও মহানবী সা. এর শক্তি, বিশাল শক্তিতে রুপ নিবে। আর তা ঠেকাবার শক্তি করোও থাকবেনা। তা ছাড়া মুহাম্মদ সা. তার সাথি সাহাবিদের মদিনায় আশ্রয় দেয়ার কারণে কুরাইশরা মদিনাবাসিদের বিদ্রোহ ঘোষণা করে, তাদের শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর হয়। তাছাড়া ইহুদিরাও মুহাম্মাদ সা. এর ক্রমবর্ধমাণ প্রতিপত্তি সহ্য করতে পারেনি। মক্কাবাসি কুরাইশরা ভাবল মদিনায় মুসলমানদের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হলে মদিনার পাশ দিয়ে সিরিয়াভিমূখি তাদের বানিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে তারা একত্রিত হয়। আর আবু সুফিয়ানের অপ্রপ্রচার এবং সে নিজেও ইসলামের জন্য, বেশ ক্ষতিকর ছিল। আবু সুফিয়ান ব্যবসায় বাণিজ্যের আবরণে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য এক কাফেলা নিয়ে সিরিয়ায় গমন করে। এ কাফেলায় অনেক ধন রত্নাদি ছিল। কিন্তু আবু সুফিয়ানের কাফেলা মদিনার মুসলমানদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, বলে মক্কায় জনরব ওঠে। এ গুজবের সত্যতা যাচাই না করে আবু জেহেল এক হাজার সৈন্য নিয়ে আবু সুফিয়ানের সাহায্যার্থে মদিনা অভিমূখে রওনা হয়। এদিকে বদর সংগঠিত হওয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ। মক্কা ও মদিনার বাণিজ্য পথে বসবাসকারি বিভিন্ন আরব গোত্র কোরাইশদের আনুগত্য স্বীকার করে, রাসুলুল্লাহ সা. এর বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। মদিনার সীমান্তবর্তী এলাকায় কুরাইশ ও তাদের সহযোগী আরব গোত্রগুলো মুসলমানদের শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দিত, ফলবান বৃক্ষ ধ্বংস করতো এবং উট, ছাগল ইত্যাদি অপহরণ করতো। এহেন প্ররোচণামূলক কার্যকলাপের কারণে, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আত্বরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হন। আর এরই ধারাবাহিকতায় যখন কাফেররা আক্রমণের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসছে এ সংবাদ রাসুলুল্লাহ সা. শুনে কি করা উচিৎ! গভীর চিন্তায় বিভোর হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় আল্লাহর মহান নির্দেশ পেয়ে চিন্তামুক্ত হন। ” আল্লাহর পথে আল্লাহর জন্য, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর, যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। তবে সীমালঙ্ঘন করোনা। কারণ তিনি সীমালঙ্ঘন কারিদের পছন্দ করেননা।” এ আদেশ পাওয়া মাত্র রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৫৬ জন আনসার এবং ৬০ জন মুহাজির নিয়ে, যুদ্ধ সংক্রান্ত মন্ত্রণাসভার পরামর্শের জন্য গঠিত একটি মুসলিম বাহিনীসহ কুরাইশ বাহিনীর মোকাবেলার জন্য বের হন। মদিনা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে বদর উপত্যকায় মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে কুরাইশদের সংঘর্ষ হয়। রাসুলুল্লাহ সা. স্বয়ং যুদ্ধ পরিচালনা করেন। রাসূলুল্লাহ সা. মুসলিম সৈন্য সমাবেশের জন্য এমন এক স্থান বেছে নেন, যেখানে সূর্যোদয়ের পর যুদ্ধ শুরু হলে, কোন মুসলিম সৈন্যের মূখে সূর্য্য কিরণ পড়বেনা। প্রথমে মল্লযুদ্ধ হয়। রাসুলুল্লাহ সা. এর নির্দেশে হযরত আমির হামজা, আলী,ও আবু উবায়দা এবং কুরাইশ নেতা ওতবা, শায়বা, এবং ওয়ালিদ ইবনে ওতবার সঙ্গে মল্লযুদ্বে অবতীর্ণ হন। শুত্রুপক্ষীয় নেতৃবৃন্দ এতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হয়। উপায়ান্তর না দেখে আবু জেহেল নিজের বাহিনীসহ মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে। তারা খুবই তীব্রভাবে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে লাগলো। কিন্তু রাসূলের হাতে গড়া মুসলিম বাহিনী নিকৃষ্ট কাফের আবু জেহেলের ভয়ে পিছু হটবার নয়। কারণ তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর জন্য, কোরানের জন্য, সত্যের জন্য, অসত্যের বিরুদ্ধে। তারা অস্ত্র ধরে ইসলামের জন্য, জীবনকে বাজি রেখে তারা যুদ্ধ করে। তাই এ সংঘবদ্ধ সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীকে আবু জেহেল কিছুতেই পিছু হঠাতে পারেনি। অসামান্য রণনৈপুণ্য, অপূর্ব বিক্রম ও অপরিসীম নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে যুদ্ধ করে। রাসুলের বাহিনী শহীদী তামান্নায় ব্যকুল, বদরের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে করাইশদের শোচনীয় ভাবে পরাজিত করে। অন্যদিকে ৭০ জন কুরাইশ সৈন্যসহ ইসলাম ও মুসলমানের চরম শুত্রু আবু জেহেল নিহত হয়। এবং সমসংখ্যক কুরাইশ সৈন্য বন্দি হয়। এ যুদ্ধে মাত্র ১৪ জন মুসলিম সৈন্য শাহাদাৎ বরণ করেন। এ যুদ্ধে খুবই দ্রুত সময়ে বিশাল সাফল্য ও মহা বিজয়ের পিছনে, অন্যতম কারণ হল, এক কথায় এ যুদ্ধে ছিল, সত্য মিথ্যার পার্থক্য। আর এ যুদ্ধই ছিল ইসলাম টিকে থাকার সেতুবন্ধন। যদি মুসলমানদের মহা বিজয় অর্জন না হত, তা হলে হয়তোবা এ জমিনে আর ইসলামের পতাকা উড়তোনা। আর এজন্যই প্রিয় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুদ্ধ ও ইসলামের চির শত্রুদের সম্পর্কে খুবই চিন্তিত ও উদ্ভিগ্ন ছিলেন। তিনি তার সাহাবিদের মনে সাহসের বীজ রোপণ করে যাচ্ছিলেন। তারপর যখন উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তখন তিনি তার মহান রবের কাছে অত্যন্ত বিণয়ের সঙ্গে এ প্রার্থনা করলেন। হে আমার আল্লাহ! তুমি যদি ইমানদারদের এ দলকে ধ্বংস করে দাও! তবে এ জমিনে আর তোমার ইবাদত করা হবেনা। হে আল্লাহ তুমিকি এটা চাও, যে আজকের পড়ে আর কখনো তোমার ইবাদত করা না হোক! তিনি মুনাজাত করতে গিয়ে এতটাই আত্মভোলা হয়ে পড়লেন যে, তার চাদর খানা তার কাধ হতে পড়ে গেল। তখনও তিনি প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকলেন। এ দৃশ্য দেখে হযরত আবু বকর রা. দ্রুত ছুটে আসলেন এবং চাদরখানা দ্বারা তার দেহ আচ্ছাদিত করে তাকে আলিঙ্গন করে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসুল সা. যথেষ্ট হয়েছে। বড়ই ক